Sunday, April 10, 2016

বিশ্বজিতের মাথায় মিলোভান তত্ত্ব

অভিষেক সেনগুপ্ত

নীল আবিরে আকাশ ছেয়ে যাবে রবি সন্ধেয়। বিদেশি ফুটবলের মতো শোনা যাবে থিমসংয়ের কোরাস। থাকবে স্লোগান। পোস্টার। ঘনঘন ফাটবে স্মোকবম্ব!

‘ওয়েস্টব্লক ব্লু’র নাম শুনেছেন?

দং হিউন দো। যাঁর দিকে আজ তাকিয়ে টিম--- অভিষেক সেনগুপ্ত 
বেঙ্গালুরু এফসির ফ্যানস ক্লাব। ভারতীয় ফুটবলে যাদের জন্ম দু’বছর আগে। এরই মধ্যে যারা গর্ব হয়ে উঠেছে গ্যালারির। বেঙ্গালুরু এফসির ঘরের মাঠে ম্যাচ মানে হাজার পাঁচেক সমর্থক হাজির। জোসেফ জর্জ যে ফ্যানস ক্লাবের মাথা।

গ্যালারি। ডাগআউট। আর মাঠ। চব্বিশ ঘণ্টা পর এই তিনের মুখে বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যের টিম। কে জানত, চব্বিশ ঘণ্টা আগেই শুরু করে দেবে ম্যাচের বল গড়াতে?

তখন বারাসতে সবে শেষ হয়েছে বাগানের ৩-৩ ম্যাচটা। এক লহমায় পাল্টে গেল আই লিগের অঙ্ক। ট্রফির দৌড় থেকে অনেকটাই মুছে গিয়েছে সঞ্জয় সেনের টিম। যুদ্ধ এখন দুই টিমের--- ইস্টবেঙ্গল ও বেঙ্গালুরু এফসি। আজ যে জিতবে, লিগের দখল অনেকটাই নিয়ে নেবে তারা। রাতে আলভিটো ডি’কুনহা বলছিলেন, ‘এ বার আর অন্যদের দিকে তাকিয়ে থাকার দরকার নেই। সবটাই আমাদের হাতে। একটা ব্যাপার পরিষ্কার, জিতলে আছি, না হলে আই লিগটা এ বারও ভুলতে হবে।’

সুনীল ছেত্রী। বেঙ্গালুরুর সেরা অস্ত্র--- অভিষেক সেনগুপ্ত
চেন্নাস্বামীর সামনের ভিড়টাকে অন্তহীন দেখাচ্ছে। সন্ধের মুখে জমায়েত। শো শেষ রাত ন’টায়। চিন্নাস্বামীতে তখন গ্যাংনামের রিহার্সল চলে। ক্রিস গেইল আসেন প্র্যাক্টিসে। এবি ডে ভিলিয়ার্স আরও ধারাল করে নেন নিজের আকাশছোঁয়া শটগুলো। সব ছাপিয়ে এক জনের জন্য তীব্র আকুতি--- বিরাট কোহলি!

রবি সন্ধেয় আকর্ষণের কেন্দ্রে চিন্নাস্বামী থাকবেই। একশো মিটার দূরের কান্তিরাভা স্টেডিয়ামও ঢুকে পড়বে আলোচনায়। এক অন্য ‘মেন ইন ব্লু’র জন্য। সুনীল ছেত্রীর বেঙ্গালুরু এফসি।

আবেগ হোক আর মাইন্ডগেম। নিছক ভুল হোক আর প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা। ‘খেলা’ শুরু হল শনি সকালেই।

র‍্যান্টি-মেন্দিরা সকাল ন’টায় কান্তিরাভাতে গিয়ে জানতে পারেন, দশটার আগে মাঠে নামা যাবে না। আগের দিনই অনুরোধ করা হয়েছিল বিএফসির কর্তাদের। এক ঘণ্টা আগে প্র্যাক্টিসে নামতে দেওয়া হোক। মৌখিক সম্মতিও মিলেছিল। কিন্তু মাঠের ছবিটা উল্টো।

মিলোভানের তত্ত্ব নিয়ে নামবেন বিশ্বজিৎ--- অভিষেক সেনগুপ্ত
ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা প্র্যাক্টিসে নামতেই শুরু হয় গোলমাল। বিএফসির এক কর্তা গালিগালাজ করেন আলভিটোকে। মেন্দিকে বের করে দেওয়া হয় মাঠ থেকে। তীব্র বাদানুবাদ গড়াচ্ছিল হাতাহাতির দিকে। পরে আলভিটো বলেন, ‘ওরা অসহযোগিতা করছে শুরু থেকে। টিম বাস পর্যন্ত পাঠায়নি। হেঁটে আসতে হয়েছে আমাদের। আগের দিন সকাল ন’টায় প্র্যাক্টিস করব জানান সত্ত্বেও ওরা এক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখল।’

প্র্যাক্টিসে নামার পরের ধাক্কাটা আরও মারাত্মক। ফেডারেশন সাসপেন্ড করায় পরের দু’ম্যাচে নেই অর্ণব মণ্ডল। দীপক মণ্ডল তাঁর জায়গায় খেলবেন। স্পোর্টিং ক্লুব দ্য গোয়ার বিরুদ্ধে আই লিগের প্রথম ম্যাচে কয়েক মিনিটের জন্য মাঠে নেমেছিলেন। বারো ম্যাচ পর ফের লাল-হলুদ জার্সিতে নামবেন বেলো রজ্জাকের সঙ্গী হয়ে।

কান্তিরাভা স্টেডিয়ামের ঠিক উল্টো দিকে টিম হোটেলের পাঁচতলার ঘরে মধ্য পঞ্চাশের এক ভদ্রলোক হাতড়ে বেড়াচ্ছেন ফুটবলের সারসত্য। তিরিশ বছর আগে যা শেখেন চিরিচ মিলোভানের কাছ থেকে। সার্বিয়ান কোচের প্রিয় ছাত্র ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, ‘মিলোভান স্যর যা শিখিয়ে গিয়েছিলেন, ভুলিনি। ফুটবলের সারসত্য। যখন সারা দুনিয়া চেপে ধরবে, বিতর্ক বাঁধাবে, নীরব থাকতে হয়। অপেক্ষা করতে হয় সময়ের জন্য। সেটা আসবেই। এলও তো! না হলে আই লিগের দরজা খুলে যায় এ ভাবে?’

মিলোভানের তত্ত্ব সম্বল করেই আজ ওয়েস্টউড নিধনে নামছেন বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য!

তিনটে ম্যাচ। তিনটে জয়। এক দিকের অঙ্ক যদি এমন হয়। অন্য দিকের পরিস্থিতি একটু অনুকূল। বিশ্বজিতের যা দরকার, তাই চাই অ্যাশলি ওয়েস্টউডের। ব্রিটিশ কোচ প্রেস মিটে সংক্ষেপে বলেন, ‘দুটো টিমের লক্ষ‌্য একই। ঘরের মাঠে তিন পয়েন্টের জন্যই নামব।’

চারটে হলুদ কার্ড দেখায় জন জনসন নেই। ডিফেন্সে ওসানু আছেন। সঙ্গী রাজেন, না হলে কিগান। ইস্টবেঙ্গলে নেই অর্ণব। চোটের গল্পে মেন্দি, কেভিন লোবো। মেন্দি শুরুতে প্র্যাক্টিস করলেও পরে উঠে গেলেন। লোবো মাঠেই নামলেন না। বিশ্বজিৎ বলছিলেন, ‘চাপ আছে। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসার স্বপ্নও তো দেখছি।’

যতই সুনীল ছেত্রীরা খেতাবের স্বপ্ন দেখুন, বেঙ্গালুরু ফুটবলমহল ইস্ট-মোহনেই আটকে। অরুময়নৈগমের কথাই ধরা যাক। কোমরের যন্ত্রণায় বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। তাই আজ সন্ধেয় মাঠে আসা হবে না। অঙ্ক-টঙ্ক এত বোঝেন না বাগানরত্ন। বলছিলেন, ‘দেখুন, মোহনবাগান ছাড়া আজও কিছু বুঝি না। বাগানকেই আবার চ্যাম্পিয়ন দেখতে চাই।‘ একটু থেমে জুড়লেন, ‘মোহনবাগান না হলে ইস্টবেঙ্গল জিতুক। ওরা অনেক দিন আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়নি।’

দীপককে ফিরিয়ে যতই ডিফেন্স শক্তপোক্ত করার কথা ভাবুন, সুনীল ছেত্রী বনাম ইস্টবেঙ্গল ক্যাচলাইনটা থেকেই যাচ্ছে। দেশের হয়ে দারুণ ফর্মে ছিলেন। আইএসএলেও। আই লিগেও পাঁচ গোল। লিংডো, কিম, ওসানুদের টিমে সেরা অস্ত্র সুনীলই।


র‍্যান্টি-দংরা আছেন। গোলমুখ খোলার জন্য। কিন্তু ডিফেন্স সামলাবেন কে? এক বছর আগে এই মাঠেই গোল করে আই লিগ জিতিয়েছিলেন বাগানকে। এক বছর পর কান্তিরাভাতে লাল-হলুদ আবির ছড়িয়ে দিতে পারবেন বেলো রজ্জাক? 

No comments:

Post a Comment